জনবান্ধব ও দূরদর্শী কর্মকর্তা: উলিপুরের প্রাক্তন ইউএনও মাহমুদুল হাসান পারভেজের স্মৃতিচারণ
উলিপুর, কুড়িগ্রাম: “এলেন, দেখলেন এবং জয় করলেন”— প্রবাদটি যেন কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুল হাসান পারভেজ-এর (দাপ্তরিক নাম মোঃ মাহমুদুল হাসান) ক্ষেত্রে অক্ষরে অক্ষরে সত্য। উলিপুর উপজেলায় তাঁর কার্যকাল স্থানীয় আপামর জনসাধারণের মনে এক গভীর ও স্থায়ী রেখাপাত করে গেছে। একজন সরকারি কর্মকর্তা যে কেবল দাপ্তরিক কাজের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে জনগণের প্রকৃত বন্ধু হয়ে উঠতে পারেন, তিনি তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
কর্মদক্ষতা ও জনবান্ধব প্রশাসন
উলিপুরে দায়িত্ব পালনের সময় মাহমুদুল হাসান পারভেজ সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় প্রশাসনিক সেবা পৌঁছে দিতে নিরলস কাজ করেছেন। তাঁর প্রশাসনের মূল ভিত্তিই ছিল— স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনকল্যাণ।
রমজানে বাজার নিয়ন্ত্রণ: রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে তিনি নিজে মাঠে নেমে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের জরিমানা করে বাজারমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখেন।
দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান: শিক্ষার প্রসারে এবং বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা রক্ষায় তিনি ছিলেন আপসহীন। দুর্গাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত রেজিস্ট্রেশন ও ভর্তি ফি নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তিনি দ্রুত পদক্ষেপ নেন এবং নিয়মের বাইরে যাওয়া সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষা: তিস্তা নদী রক্ষা এবং ফসলি জমির টপসয়েল (উপরিভাগের মাটি) কাটা ও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে তাঁর সাহসী ভূমিকা ও নিয়মিত অভিযান স্থানীয় পরিবেশ রক্ষায় বড় অবদান রেখেছে।
মাঠপর্যায়ে ভোটার সচেতনতা ও দূরদর্শিতা
জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করার লক্ষ্যে তিনি উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে নিজে উপস্থিত থেকে কাজ করেছেন।
”একটি গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য ভোটারদের সচেতনতা ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ অপরিহার্য। ভোটাররা যেন কোনো ভয়ভীতি ছাড়া নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সে লক্ষ্যে প্রশাসন বদ্ধপরিকর।”
— মাহমুদুল হাসান পারভেজ (তৎকালীন ভোটার উদ্বুদ্ধকরণ উঠান বৈঠকে)
তিনি উপজেলার চরাঞ্চলসহ দুর্গম গ্রামগুলোতে গিয়ে সাধারণ মানুষের বিশেষ করে নারী ভোটারদের সচেতন করতে উঠান বৈঠক করেন এবং লিফলেট বিতরণ করে এক নজিরবিহীন জনসচেতনতা তৈরি করেন।
কেন তিনি সাধারণ মানুষের কাছে ‘একজন ভালো মানুষ’?
সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর সততা ও কর্মনিষ্ঠা তো ছিলই, তবে তাঁর সবচেয়ে বড় গুণ ছিল মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং বিনয়ী আচরণ। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী— সবার জন্য তাঁর দপ্তরের দরজা ছিল সব সময় উন্মুক্ত। যেকোনো সংকট মুহূর্তে তিনি ত্বরিত ও মানবিক সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। চিলমারী ও উলিপুরের সীমান্ত অঞ্চলে বিভিন্ন সংকট বা সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে তিনি মাঠপর্যায়ে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে দক্ষতার সাথে সমাধান করেছেন।
বিদায়ের পরও হৃদয়ে অমলিন
সম্প্রতি তিনি উলিপুর থেকে বদলি হয়ে যাওয়ার পরও স্থানীয় সচেতন মহল এবং সাধারণ মানুষ তাঁর সততা ও কর্মনিষ্ঠার কথা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, পদ বা ক্ষমতা বড় কথা নয়, মানুষের কল্যাণে কাজ করে তাদের হৃদয়ে স্থান করে নেওয়াই একজন প্রকৃত সরকারি সেবকের আসল সার্থকতা।
উলিপুরের মানুষের মতে, মাহমুদুল হাসান পারভেজের মতো একজন দক্ষ, সৎ ও ভালো মনের মানুষ দেশের প্রতিটি উপজেলাতেই প্রয়োজন। তাঁর কর্মজীবনের উত্তরোত্তর সাফল্য ও ভবিষ্যৎ পথচলার জন্য উলীপুরবাসীর পক্ষ থেকে রইল নিরন্তর শুভকামনা

স্টাফ রিপোর্টার 


























