দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় আলোচনা তৃণমূলের সাংগঠনিক অবস্থা নিয়ে। তৃণমূল পর্যায়ে দলের বিভিন্ন ইউনিটে অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং, নব্য নেতাকর্মীদের অনুপ্রবেশ এবং এর ফলে ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের উপেক্ষিত হওয়ার অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
তৃণমূল পর্যায়ে গ্রুপিং ও কোন্দল
দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও পৌরসভা কমিটিতে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে দৃশ্যমান গ্রুপিং লক্ষ্য করা যাচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে শীর্ষ নেতাদের আধিপত্য বিস্তার, নিজস্ব বলয় তৈরি এবং পকেট কমিটি গঠনের চেষ্টার কারণে এই কোন্দল আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে।নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব: এক এলাকায় একাধিক প্রভাবশালী নেতার মনোনয়ন কেন্দ্রিক বা সাংগঠনিক নেতৃত্ব দখলের প্রতিযোগিতা দলের চেইন অব কমান্ডকে দুর্বল করছে।সমন্বয়ের অভাব: কেন্দ্রের পক্ষ থেকে কোন্দল নিরসনে বিভিন্ন সময় উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্থানীয় কোন্দলের কারণে অনেক স্থানেই সমন্বিত রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ত্যাগী নেতাকর্মীদের ক্ষোভ ও বঞ্চনা
দলের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে যারা মামলা-হামলা, জেল-জুলুম ও অর্থনৈতিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন, তাদের একটি বড় অংশ বর্তমানে নিজেদের উপেক্ষিত মনে করছেন।মূল্যায়নের অভাব: অনেক এলাকায় ত্যাগী ও মাঠপর্যায়ের সক্রিয় নেতাদের বাদ দিয়ে তুলনামূলক কম নিষ্ক্রিয় বা সুবিধাবাদীদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর অভিযোগ উঠছে।হতাশা: বছরের পর বছর দলের জন্য শ্রম ও আত্মত্যাগ করার পর যোগ্য স্থান না পেয়ে তৃণমূলের একটি অংশ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে, যা দলের ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক শক্তির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
হাইব্রিড’ ও সুবিধাবাদীদের অনুপ্রবেশ
কৌশলগত কারণে বা স্থানীয় নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বিভিন্ন স্থানে দলে নব্য বা ‘হাইব্রিড’ নেতাকর্মীদের আগমন ঘটেছে বলে অভিযোগ করছেন খোদ দলের ভেতরের একাংশ আর্থিক লেনদেন ও পদ বাণিজ্য: অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো এলাকায় ত্যাগী নেতাকর্মীদের কোণঠাসা করে আর্থিক সুবিধা বা ব্যক্তিগত আনুগত্যের বিনিময়ে বিতর্কিত ব্যক্তিদের পদ দেওয়া হচ্ছে।বিতর্কিত কর্মকাণ্ড: এই নব্য অনুপ্রবেশকারীদের অনেকের বিরুদ্ধে স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন অপকর্ম, চাঁদাবাজি বা প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।
কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অবস্থান ও চ্যালেঞ্জ
বিএনপির হাইকমান্ড ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ অবশ্য তৃণমূলের এই চিত্র সম্পূর্ণ অস্বীকার করছেন না। তারা বিভিন্ন সময়ে কোন্দল নিরসন এবং ত্যাগীদের মূল্যায়নের আশ্বাস দিয়েছেন।পুনর্গঠন প্রক্রিয়া: দলটিকে তৃণমূল থেকে শক্তিশালী করতে বিভিন্ন জেলা ও অঙ্গসংগঠনের কমিটি ভেঙে নতুন সার্চ কমিটির মাধ্যমে ত্যাগীদের খোঁজার চেষ্টা চলছে।শাস্তিমূলক ব্যবস্থা: দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ বা অপকর্মে লিপ্ত থাকার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে অনেক ক্ষেত্রে বহিষ্কার বা সাংগঠনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।
তৃণমূলের ক্ষোভ ও গ্রুপিং দূর করে প্রকৃত ত্যাগী নেতাকর্মীদের হাতে নেতৃত্ব ফিরিয়ে দেওয়াই এখন বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নব্য অনুপ্রবেশকারীদের কঠোর হস্তে দমন এবং অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চার মাধ্যমেই কেবল দল তার মাঠপর্যায়ের ঐক্য ও সাংগঠনিক শক্তি পুনরুত্থান করতে সক্ষম হবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

বিশেষ প্রতিনিধি: 





















