একটি রাজনৈতিক দলের প্রাণশক্তি হলো তার মাঠপর্যায়ের কর্মীবাহিনী। ঝড়-বৃষ্টি, রোদ-উপেক্ষা করে যারা দলের আদর্শকে বুকে ধারণ করে রাজপথে টিকে থাকে, তারাই দলের প্রকৃত চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে এই ত্যাগী ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের অবদান অনস্বীকার্য। বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীরা অসংখ্য মামলা, হামলা, জেল-জুলুম এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিপীড়ন সহ্য করেছেন। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি বড় প্রশ্ন বারবার সামনে আসছে: দল কি তার এই ত্যাগী ও বঞ্চিত কর্মীদের সঠিক মূল্যায়ন করতে পারছে? কবে হবে তাদের কাঙ্ক্ষিত মূল্যায়ন?

​১. রাজপথের সংগ্রাম ও নেতাকর্মীদের আত্মত্যাগ
​২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত বিএনপি এক কঠিন ও প্রতিকূল সময় পার করছে। দলীয় প্রধান বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস ও অসুস্থতা, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্বাসিত জীবন এবং হাজার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দলটিকে এক অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

​এই দীর্ঘ সময়ে যারা মাঠপর্যায়ে দলের ব্যানার ধরে রেখেছিলেন, তারা হলেন সাধারণ কর্মী ও স্থানীয় স্তরের মধ্যম সারির নেতৃবৃন্দ। বহু কর্মী নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে ফেরারি জীবন যাপন করেছেন, ব্যবসা-বাণিজ্য হারিয়েছেন এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ বিপন্ন করেছেন। দলের প্রতি অন্ধ ভালোবাসাই ছিল তাদের এই আত্মত্যাগের একমাত্র কারণ। তাদের প্রত্যাশা ছিল, দল যখনই কোনো সুযোগ পাবে বা পুনর্গঠিত হবে, তখন তাদের এই কষ্টের স্বীকৃতি মিলবে।

​২. বঞ্চিত হওয়ার বেদনা ও তৃণমূলের ক্ষোভ
​দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার কারণে দলের ভেতরে এক ধরনের সুযোগসন্ধানী ও অনুপ্রবেশকারী গোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটে—এটি যেকোনো বড় রাজনৈতিক দলের জন্যই একটি সাধারণ রোগ। বিএনপির ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। তৃণমূলের অনেক ত্যাগী কর্মীর অভিযোগ:​অনুপ্রবেশকারীদের দাপট: আন্দোলন-সংগ্রামে যাদের রাজপথে দেখা যায়নি, কিংবা যারা অন্য দল থেকে এসে যোগ দিয়েছেন, অনেক সময় তারাই দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ বা লবিংয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন।​পকেট কমিটি গঠন: স্থানীয় পর্যায়ে ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের বাদ দিয়ে নিজেদের অনুসারীদের নিয়ে ‘পকেট কমিটি’ গঠনের প্রবণতা কর্মীদের মাঝে চরম ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিয়েছে।​আর্থিক ও সামাজিক অবহেলা: বহু কর্মী মামলার খরচ চালাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। দল থেকে আইনি বা আর্থিক সহায়তা যেভাবে পাওয়ার কথা ছিল, অনেক ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতার কারণে তা মাঠপর্যায়ে পৌঁছায়নি।

​যখন একজন কর্মী দেখেন যে বছরের পর বছর জেল খাটার পরও তাকে মূল্যায়ন না করে কোনো এসি রুমে বসা সুবিধাবাদীকে পদ দেওয়া হচ্ছে, তখন দলের প্রতি তার আনুগত্যে ফাটল ধরা স্বাভাবিক।

​৩. দল পুনর্গঠন ও মূল্যায়নের বর্তমান প্রচেষ্টা
​বিএনপির হাইকমান্ড যে এই বিষয়টি একদমই জানেন না, তা কিন্তু নয়। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিভিন্ন সময়ে ভার্চুয়াল সভায় তৃণমূলের নেতাকর্মীদের খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করেছেন এবং ত্যাগীদের মূল্যায়নের ব্যাপারে বারবার তাগিদ দিয়েছেন। দল পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও অঙ্গসংগঠনগুলোর (যেমন ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল) নতুন কমিটি গঠন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

​তবে এই মূল্যায়ন প্রক্রিয়াটি এখনো পুরোপুরি প্রশ্নাতীত হতে পারেনি। অনেক স্থানেই পুরনো ক্ষোভ রয়ে গেছে। ত্যাগী কর্মীদের মূল্যায়নের অর্থ কেবল একটি পদ দেওয়া নয়; বরং তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া, তাদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি দেওয়া এবং দলের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় তাদের সম্পৃক্ত করা।

​৪. কবে এবং কীভাবে সম্ভব প্রকৃত মূল্যায়ন?
​ত্যাগীদের মূল্যায়ন কোনো একদিনের অলৌকিক ঘটনা নয়; এটি একটি ধারাবাহিক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার বিষয়। বিএনপিকে যদি আগামী দিনে একটি শক্তিশালী ও সংগঠিত দল হিসেবে ঘুরে দাঁড়াতে হয়, তবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি:​তৃণমূলের ডেটাবেজ তৈরি: আন্দোলন-সংগ্রামে কোন কর্মী কতবার জেলে গেছেন, কার বিরুদ্ধে কয়টি মামলা রয়েছে, তার একটি সঠিক ও নিরপেক্ষ তালিকা বা ডেটাবেজ তৈরি করা প্রয়োজন। এর ফলে লবিং বা স্বজনপ্রীতির সুযোগ কমে যাবে।কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন: পকেট বা প্রেস রিলিজ কমিটির সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে এসে স্থানীয় কর্মীদের প্রত্যক্ষ ভোটে বা মতামতের ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচন করতে হবে।​অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিতকরণ: দুঃসময়ে যারা দল ত্যাগ করেছিলেন বা নিষ্ক্রিয় ছিলেন, সুসময়ে তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।​ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানো: যেসব কর্মী নিহত বা পঙ্গু হয়েছেন, কিংবা অর্থনৈতিকভাবে পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছেন, দলীয় তহবিল থেকে তাদের নিয়মিত সহায়তা নিশ্চিত করা উচিত।

​উপসংহার
​একটি রাজনৈতিক দলের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার আদর্শিক কর্মী। ক্ষমতার রাজনীতিতে জোয়ার-ভাটা থাকবেই, কিন্তু কর্মীবাহিনীর মনোবল ভেঙে গেলে দলের অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। বিএনপির ত্যাগী ও বঞ্চিত কর্মীরা আজ চাতক পাখির মতো চেয়ে আছেন নেতৃত্বের সদিচ্ছার দিকে।

​”কবে হবে মূল্যায়ন?”—এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে দলের নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শিতা ও সততার ওপর। সুবিধাবাদীদের সরিয়ে রাজপথের পরীক্ষিত সৈনিকদের যখন দলের চালকের আসনে বসানো হবে, ঠিক সেদিনই হবে বঞ্চিত কর্মীদের প্রকৃত মূল্যায়ন। আর এটি যত দ্রুত হবে, দল হিসেবে বিএনপি তত বেশি শক্তিশালী ও জনমুখী হয়ে উঠতে পারবে।