উত্তরবঙ্গের জনপদ কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার ইতিহাসে যে কজন মানুষ নিজেদের কর্মগুণে অমর হয়ে আছেন, নুরুল ইসলাম আমিন তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। তিনি কেবল একজন ব্যক্তি নন, বরং উলিপুরের শিক্ষা বিস্তারের এক নীরব বিপ্লবের নাম। একজন সফল দানবীর এবং পাণ্ডিত্যের অধিকারী হিসেবে তিনি এই জনপদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি মজবুত করতে অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন।

বহুভাষাবিদ হিসেবে পাণ্ডিত্য

​এন. আমিন ছিলেন একজন বিরল মেধার অধিকারী মানুষ। ভাষাচর্চার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ তাঁকে কেবল একজন শিক্ষিত মানুষ হিসেবে নয়, বরং একজন সত্যিকারের পণ্ডিত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তিনি নিম্নলিখিত ভাষাগুলোতে সমানভাবে পারদর্শী ছিলেন:

বাংলা: মাতৃভাষার প্রতি তাঁর ছিল অকৃত্রিম মমতা, যা তাঁর সাহিত্য চর্চায় প্রকাশ পায়।

​ইংরেজি ও উর্দু: দাপ্তরিক ও যোগাযোগ রক্ষার প্রয়োজনে এই দুই ভাষায় তাঁর বিশেষ দক্ষতা ছিল।

​ফারসি: ধ্রুপদী ফারসি সাহিত্যে তাঁর দখল ছিল ঈর্ষণীয়।

​নাগরি লিপি: বিশেষ করে সিলেট ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলের প্রাচীন ‘সিলেটি নাগরী’ লিপির পাঠোদ্ধার ও অনুধাবনে তাঁর বিশেষ জ্ঞান ছিল বলে জানা যায়, যা তাঁর ভাষাতাত্ত্বিক বৈচিত্র্যকে প্রমাণ করে।

​শিক্ষা ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান

​উলিপুরের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে এন. আমিনের অবদান অপরিসীম। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতির উন্নতির একমাত্র চাবিকাঠি হলো মানসম্মত শিক্ষা।

প্রতিষ্ঠান স্থাপনে সহায়তা: তিনি স্থানীয় পর্যায়ে এনএস আমিন রেসিংগেনসিয়াল স্কুলসহ স্কুল, মাদ্রাসা ও পাঠাগার স্থাপনে জমি দানসহ প্রভূত আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছেন।

​দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পৃষ্ঠপোষকতা: অর্থকষ্টে যেন কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বন্ধ না হয়, সেদিকে তাঁর সজাগ দৃষ্টি ছিল। তিনি ব্যক্তিগত তহবিল থেকে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে বৃত্তি প্রদান করতেন।

​উলিপুর এনএস আমিন রেসিডেন্সিয়াল স্কুল সহ উলিপুরের অন্যতম প্রধান বিদ্যাপীঠগুলোর বিকাশে তাঁর পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত।

​একজন দানবীর হিসেবে পরিচিতি

​নুরুল ইসলাম আমিনের দানশীলতা কেবল শিক্ষা খাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, সামাজিক সংস্কার এবং আর্তমানবতার সেবায় তিনি অকাতরে দান করে গেছেন। উলিপুরের সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ‘দাতা’ হিসেবে এক বিশেষ সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত। কোনো প্রকার প্রচারের মোহ ছাড়াই তিনি আজীবন জনকল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।

​উপসংহার

​এন. . আমিন ছিলেন একজন আলোকিত মানুষ, যিনি তাঁর জ্ঞান এবং সম্পদকে বিলিয়ে দিয়েছেন সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে। তাঁর মতো গুণী মানুষের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান প্রজন্ম নিজেদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। উলিপুরের সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত ইতিহাসে এন. আমিনের নাম চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। মমিনুল ইসলাম লেখক সাংবাদিক।