​বাংলার কৃষি ঐতিহ্যের সাথে মিশে ছিল এক জোড়া গরু, কাঠের লাঙল আর কৃষকের ‘হৈ হৈ’ শব্দ। হাজার বছরের এই ঐতিহ্য আজ যান্ত্রিক সভ্যতার ভিড়ে হারিয়ে গেছে। লাঙল-জোয়ালের জায়গা দখল করে নিয়েছে যান্ত্রিক ‘কলের লাঙল’ বা পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টর।

পরিবর্তনের নেপথ্যে সময় ও খরচ

​এক সময় কৃষকরা নিজেদের গরু দিয়ে জমি চাষ করতেন। এতে সময় বেশি লাগলেও খরচ ছিল সামান্য। কিন্তু বর্তমানে জীবনযাত্রার মান ও সময়ের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষকরা প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছেন।সময় সাশ্রয়: যেখানে এক বিঘা জমি গরুর হাল দিয়ে চাষ করতে পুরো দিন লেগে যেত, সেখানে কলের লাঙলে সময় লাগে মাত্র ৩০-৪০ মিনিট।​শ্রম লাঘব: গরু পালন, ঘাস কাটা এবং রোদে পুড়ে জমি চাষ করার চেয়ে ভাড়া করা মেশিনে চাষ করা এখন কৃষকদের কাছে অনেক সহজসাধ্য।​গবাদি পশুর সংকট: চারণভূমির অভাব এবং গবাদি পশুর উচ্চমূল্যের কারণে অনেক কৃষক এখন আর বাড়িতে হাল চাষের গরু রাখতে পারছেন না

বর্তমানে গ্রামগঞ্জে পাওয়ার টিলারের পাশাপাশি ট্রাক্টর ও সিডার মেশিনের ব্যবহার বেড়েছে। আধুনিক এসব যন্ত্র দিয়ে জমি চাষের পাশাপাশি মই দেওয়া এবং বীজ বপনের কাজও একসাথেই করা যাচ্ছে। এতে চাষের গভীরতা বাড়ছে এবং ফলনও ভালো হচ্ছে বলে অনেক কৃষক মনে করে।

প্রবীণ কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এক সময় লাঙল চাষের সময় পাড়ার কৃষকদের মধ্যে যে মেলবন্ধন ও আনন্দ ছিল, তা যান্ত্রিক যুগে হারিয়ে গেছে। আগে ভোররাত থেকে হাল চাষ শুরু হতো, আর বাড়ির ছোটরা গরুর হালের পেছনে পেছনে ঘুরে বেড়াত। এখন সেই উৎসবমুখর পরিবেশ আর নেই

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় কৃষিতে গতি এসেছে, বেড়েছে উৎপাদন—এটি অবশ্যই ইতিবাচক। তবে কাঠের লাঙল আর গরুর হাল ছিল আমাদের কৃষিসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। নতুন প্রজন্মের কাছে এই চিত্র হয়তো এখন কেবল ছবির বইয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে। ঐতিহ্যের এই বিবর্তন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সময় কারো জন্য থেমে থাকে না